Sunday, January 6, 2008

আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশের পর পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া




আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশের পর পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তিসংস্থা বা আইএইএর মহাসচিব মো: আল বারাদি ইরানের পরমানু কর্মসূচীর ব্যাপারে তার সর্বশেষ প্রতিবেদন সম্প্রতি এই সংস্থার নির্বাহী বোর্ডে তুলে ধরেছেন। এটাকে আল বারাদির এ যাবতকালের সবচেয়ে যৌক্তিক ও ইতিবাচক প্রতিবেদন হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইরান এবং আইএইএর কর্মকর্তারা ভিয়েনা ও তেহরানে তিন দফা আলোচনার পর আগামী দুই মাসের মধ্যে ইরানের পরমাণু বিষয়ে বিরাজমান অস্পষ্টতা দূর করা ও আইএইএর অবশিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছার পর আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতা হওয়ার খবর প্রকাশের কয়েক দিন পর আল বারাদির সচিব ওয়ালী হাইনোনেন ভিয়েনায় বলেছিলেন, ইরান তার প্লুটোনিয়াম গবেষণা সংক্রান্ত আইএইএর সমস্ত প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিয়েছে এবং এই সংস্থা এখন মনে করে ইরানের প্লুটোনিয়াম বিষয়ে বিতর্কের আর কোন অবকাশ নেই।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে যে হৈ-চৈ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে প্লুটোনিয়াম সংক্রান্ত গবেষণা। কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সময় প্লুটোনিয়াম উৎপন্ন হয় এবং এটি দুই ধরণের কাজে ব্যবহার করা যায়।
ইরান বহুবার একথা বলেছে যে, বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রপাতিগুলো আগে থেকেই দুষণযুক্ত ছিল এবং শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত ইরানের পরমাণু প্লান্টে কখনও কোন প্লুটোনিয়াম উৎপন্ন হয়নি। আইএইএর পরিদর্শক দল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করার পর গত ২০ শে আগষ্ট এই সংস্থা ঘোষণা করে, ইরানের কর্মকর্তাদের কথায় ও কাজে মিল পাওয়া গেছে, সুতরাং প্লুটোনিয়াম নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটলো। ইরান ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি কোন ষড়যন্ত্র এবং হস্তক্ষেপ না করে তাহলে অন্তত আগামী দুই মাসের মধ্যে ইরানের পরমাণু বিষয়ে সকল বিতর্কের অবসান ঘটবে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এসেছে। এ কারণে বিভিন্ন সংবাদ ও রাজনৈতিক মহল বিশেষ করে ভিয়েনায় আইএইএর কর্মকর্তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির প্রতিবেদনকে ইতিবাচক হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আগেই যেটা ধারণা করা হয়েছিল সেটা হচ্ছে, আল বারাদির এ রিপোর্ট এবং ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের প্রচন্ড বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছে। এই দেশগুলোর বিরোধীতার কারণ অবশ্য সবারই জানা। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে চেষ্টা চালাচ্ছে আল বারাদির এ প্রতিবেদন তাদের সে চেষ্টাকে ভন্ডুল করে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে হুমকী হিসাবে তুলে ধরে তার অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স ইরান এবং আইএইএর মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিল।
কূটনৈতিক উপায়ে ইরানের পরমাণু সমস্যার সমাধান হোক যুক্তরাষ্ট্র তা কখনই চায় না এবং ওয়াশিংটন লন্ডন ও প্যারিসকে সাথে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চরিতার্থ করার চেষ্টায় রয়েছে। এই তিন দেশের পদস্থ কর্মকর্তারা আল বারাদির প্রতিবেদন অগ্রাহ্য করে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে তাদের অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলা অব্যাহত রেখেছে। অথচ আল বারাদি তার প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পর জার্মানীর দৈনিক স্পিগেল পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে অধিকাংশ অস্পষ্টতা বা সন্দেহ দূর হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ইরান ও আইএইএর মধ্যে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং সেই সাথে কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেয়া উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা আল বারাদির এ বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তার উপর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে। ফলে আল বারাদি এ কথা বলতে বাধ্য হন যে, সামরিক উপায়ে যারা ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধান করতে চায় তারা আসলে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
আইএইএর মহাসচিব আল বারাদি গত মাসেও বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যারা সামরিক উপায়ে ইরানের পরমাণু সর্মসূচী স্তব্ধ করে দেয়ার কথা বলছে, তারা ইরাকের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি বাহ্যিক সমর্থন জানালেও তাদের আচরণ ও কাজেকর্মে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে তারা আসলে কূটনৈতিক সমাধান চায় না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই আইএইএ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা জ্যাভিয়ার সোলানার সাথে ইরানের আলোচনায় অচলবস্থা সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ গত সপ্তায় মার্কিন সেনাদের এক সমাবেশে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরীর চেষ্টা করছে বলে দাবী করে বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরীতে সক্ষম হলে মধ্যপ্রাচ্য পরমাণু হলোকাস্ট প্রত্যক্ষ করবে। বুশের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই পরমাণু হলোকাষ্টের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা নিক্ষেপের ঘটনা এবং দেশটির নতুন ধরণের পরমাণু বোমা তৈরীর প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মার্কিন তোষণ নীতির বিরোধীতা করলেও এখন তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির প্রতিবেদনের বিরোধীতা করেছেন। নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের উদ্যোগকে লন্ডন সমর্থন করবে বলে গর্ডন ব্রাউন জানান। তিনি লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা সঠিক এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এর আগে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের ঘোষিত তিনটি ইশতেহারকেও সঠিক বলে অভিহিত করেছেন। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে এ ধরণের উদ্দেশ্যমূলক ইশতেহার প্রকাশ ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানে কোন ভূমিকাতো রাখবেই না বরং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে সুর মিলিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোযিও আইএইএর মহাসচিব আল বারাদির প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর উদ্দেশ্য সামরিক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবী করেন পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী ইরানকে ফ্রান্স কখনই মেনে নেবে না।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ মাত্র গুটি কয়েক ইউরোপীয় দেশ যদি অযথা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরোধীতায় অবতীর্ণ না হত তাহলে আল বারাদির এবারের প্রতিবেদন ইরানের পরমাণু সমস্যা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারতো। কিন্ত সমস্যাটা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরমাণু ইস্যুটিকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আর এ কারণেই তারা যে কোন উপায়ে এ সমস্যা জিইয়ে রাখতে চাইছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, ইরান আইএইএর সাথে সম্পাদিত চুক্তি বা সমঝোতা অনুযায়ী পরমাণু বিষয়ে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আল আরাদিও ইরানের এ পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
আইএইএর সাথে ইরানের সহযোগিতা এবং ইরানের পরমাণু বিষয়ে আল আলবাদির ইতিবাচক প্রতিবেদন দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার নতুন সুযোগ বা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ ব্যাপারে আলী লারিজানি বলেছেন, আলোচনার যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা মূলত: ৫+১ গ্রুপ ও আইএইএর জন্য একটা পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিমারা আইএইএর আওতায় ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কিন্তু আল বারাদির প্রতিবেদনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও বৃটেন যে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে তাতে বোঝা যায়, এই দেশ তিনটি নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে আরো একটি ইশতেহার প্রকাশের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের বেআইনী পদক্ষেপ, শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযু্ক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকে ইরানের জনগণকে বিরত রাখতে পারবে না।
এখন এটা সবার কাছে পরিস্কার যে, পশ্চিমারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। মোহাম্মদ আল বারাদি সম্প্রতি কোন দেশের নাম উল্লেখ না করে, ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতা এবং তার প্রতিবেদনের ব্যাপারে পশ্চিমাদের নেতিবাচক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আল বারাদি বলেছেন, আইএইএর ইরানের পরমাণু কর্মসূচীতে বিচ্যুতির কোন প্রমাণ পায়নি এবং ইরান বেআইনী পরমাণু তৎপরতা চালাচ্ছে এমন কোন প্রমাণ পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দেখাতে পারেনি।
পশ্চিমারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচী বিশ্বের জন্য হুমকী বলে যে দাবী করছে আল বারাদির এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের সে দাবী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও আইএইএর মহাসচিবের এ প্রতিবেদন ওয়াশিংটন, লন্ডন ও প্যারিসের তেহরান বিরোধী মনোভাবের অবসান ঘটাবে বলে মনে হয় না। আল বারাদির প্রতিবেদন থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, ইরানের পরমাণু সমস্যা আইএইএর মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব এবং পশ্চিমারা ইরানের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে তা আন্তর্জাতিক সমাজের কাম্য নয়। ( আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর-২০০৭) #







































stat(22,0);

No comments: