Sunday, January 6, 2008

পরমাণু শক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার

পরমাণু শক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার
মানব জাতি এক শতকেরও বেশী সময় ধরে পরমাণু বিদ্যার সাথে পরিচিত ৷ এ দীর্ঘ সময়ে বিজ্ঞানীরা পরমাণু বিষয়ে এমন অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন যে তার ফলে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে ৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও পরমাণু শক্তির কথা বললেই বিশ্বের মানুষের মনে গণহত্যা, ধবংসযজ্ঞ, আতঙ্ক ও ভয়াবহ বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে ওঠে ৷ পরমাণু শক্তি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে এই নেতিবাচক বা আতংকগ্রস্ত মনোভাব সৃষ্টির পেছনে কিছু কারণও রয়েছে ৷ এসব কারণের মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার একাধিক পরমাণু বোমার আঘাতে জাপানের হিরোশীমা ও নাগাসাকি শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি এবং এ দুটি শহর ধবংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল ৷ পরমাণু শক্তি ব্যবহারের ভয়াবহ পরিণতির সেটাই ছিল প্রথম দৃষ্টান্ত বা সাক্ষ্য ৷ ঐ ঘটনার পরও আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পরমাণু অস্ত্র মজুদের বিপজ্জনক প্রতিযোগিতার কারণে সারা বিশ্বের মানুষ খুবই শঙ্কিত ছিল এবং এখনও পরমাণু অস্ত্রের বিপদ থেকে বিশ্ব আশঙ্কামুক্ত নয় ৷ এরই পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা পরমাণু শক্তির কল্যাণকর দিক সম্পর্কেও অসচেতন ছিলেন না ৷ তাঁরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পরমাণু শক্তির কল্যাণকর প্রয়োগ বা অন্য কথায় পরমাণু শক্তিকে মানুষের জন্যে বিভিন্ন কল্যাণকর কাজে ব্যবহারের পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন ৷ পরমাণুর বিভাজন ঘটিয়ে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে পরিণত করার প্রযুক্তি বা জ্ঞানের মাধ্যমে পরমাণু শক্তির এসব কল্যাণকর প্রয়োগ বা ব্যবহারের প্রচলন সম্ভব হয়েছে ৷ তেজস্ক্রিয় পদার্থ আবিষ্কারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তেজস্ক্রিয় পদার্থের অনু বা পরমাণু বিভাজনের বিষয়গুলো আবিষ্কারের সময় বিজ্ঞানীরা এ প্রযুক্তিকে মানবজাতির বিরুদ্ধে অপব্যবহারের চিন্তা করেননি ৷ পদার্থ বিজ্ঞানীরা উনবিংশ শতকের শেষের দিকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং এসব পদার্থের আলোক বিচ্ছুরণের বিষয়টি আবিষ্কার করতে সক্ষম হন ৷ গত শতকে বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে রেডিওএক্টিভ বা তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহার শুরু করেন ৷ কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণার বিষয়টি মূলতঃ পারমাণবিক বোমা নির্মাণের গবেষণার রূপ নেয় ৷ অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা পুণরায় পরমাণু প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ৷পরমাণু প্রযুক্তির সবচেয়ে বেশী প্রচলিত শান্তিপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ৷ জ্বালানী সংকট বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংকট ৷ জ্বালানী তেল, গ্যাস এবং খনিজ কয়লা প্রভৃতি ফসিল জ্বালানী শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে ৷ এ ছাড়াও এসব জ্বালানী পরিবেশকে ব্যাপক মাত্রায় দূষিত করে ৷ অন্যদিকে তেল বা পেট্রোল জাতীয় জ্বালানীকে পেট্রোকেমিকেল কারখানায় ব্যবহার করে তার মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করা অনেক বেশী লাভজনক ৷ বর্তমানে বিশ্বের দেশগুলোতে, বিশেষ করে, শিল্পন্নোত দেশগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে পরমাণু চুল্লী নির্মাণের হার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে ৷ বর্তমানে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের শতকরা ষোলো ভাগেরও বেশী উৎপাদিত হচ্ছে পরমাণু জ্বালানীর মাধ্যমে ৷ অন্য কথায় বিশ্বের ছয়ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎ পারমাণবিক চুল্লীর মাধ্যমে উৎপাদিত হচ্ছে এবং এ ধরণের চুল্লীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে ৷ কিন্তু দুঃখজনকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এ ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে৷ পারমাণবিক জ্বালানীর মাধ্যমে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে তার মাত্র শতকরা ৩৯ ভাগ উৎপাদিত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৷ অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোই বিশ্বের অধিকাংশ পরমাণু চুল্লীর অধিকারী ৷ বিজ্ঞানের অন্য যে শাখায় পরমাণু শক্তির ব্যাপক ব্যবহার চলছে তা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞান৷ আজকাল অনেক রোগের প্রতিষেধক ও চিকিৎসার জন্যে বিভিন্ন ধরনের রশ্মি এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে ৷ প্রাণঘাতি রোগ ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্যে পারমাণবিক রশ্মি এবং পারমাণবিক ঔষধ কার্যকরি বলে প্রমাণিত হয়েছে ৷ এ লক্ষ্যে এমন অনেক যন্ত্রপাতি বের হয়েছে যেগুলো দিয়ে মস্তিস্ক, অন্ত্র, প্রোষ্টেট ও বক্ষের ক্যান্সার সনাক্ত করা যায় এবং এর ফলে এসব রোগের চিকিৎসা করা সহজ হয়েছে ৷ এ ছাড়াও থাইরয়েড, রক্ত শূণ্যতা, প্রদাহ ও পচনের মতো বিভিন্ন রোগ পারমাণবিক রশ্মির মাধ্যমে খুব ভালোভাবে সনাক্ত করা হয়৷ এসব রোগ সনাক্ত করার কাজে উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্য নেয়া হয় এবং পারমাণবিক রশ্মি অথবা তেজস্ক্রিয় পদার্থের ইনজেকশান ব্যবহৃত হয় ৷ কম্পিউটার টমোগ্রাফি স্ক্যান বা সি.টি স্ক্যান করার যন্ত্রগুলো, বিশেষ করে এ যন্ত্রের আধুনিক সংস্করণগুলোয় মানুষের শরীরের বিভিন্ন সমস্যাগুলো সনাক্ত করার জন্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে৷ ম্যাগনেটিক রিজোনেন্স ইমেজিং বা এম .আর. আই নামের পরীক্ষার সময়ও শরীরের বিভিন্ন অংশে কিছু তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রবেশ করিয়ে ঐসব স্থানের ছবি তোলা হয় ৷ মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অসঙ্গতিগুলো সনাক্ত করার জন্যে এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় ৷ এ ছাড়াও চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রচলিত আরো কিছু যন্ত্রপাতি ও পদ্ধতিতে পারমাণবিক পদার্থ ব্যবহৃত হয় ৷ আজকাল লেজার রশ্মি ও অন্য কিছু তেজস্ক্রিয় রশ্মির মাধ্যমে অস্ত্রপচারও করা হয়ে থাকে ৷ এসব অস্ত্রপচারের সময় সাধারণত রক্তপাত ঘটে না এবং কোনো ব্যথাও পাওয়া যায় না ৷ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো পরমাণু বোমায় ব্যবহৃত পরমাণু শক্তি লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেও এই একই শক্তিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রয়োগ করার মাধ্যমে মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা ও বিভিন্ন রোগ ব্যাধি সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে ৷ পারমাণবিক পদার্থের মাধ্যমে পশু পাখীরও চিকিৎসা হচ্ছে ৷ পারমাণবিক পদার্থের মাধ্যমে পশু পাখী সম্পর্কিত শিল্পের বিভিন্ন দ্রব্যকে জীবাণূমুক্ত ও স্বাস্থ্য সম্মত করা হয় ৷ এমনকি পশু পাখীর বংশগত উন্নয়ন এবং অপেক্ষাকৃত বেশী উপকারী প্রাণী প্রতিপালন ও লালনের কাজেও পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে ৷ খাদ্য শিল্পের ক্ষেত্রেও পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে ৷ পারমাণবিক পদার্থ বা রশ্মির মাধ্যমে খাদ্য দ্রব্য নষ্টকারী বা খাদ্য দ্রব্যের জন্যে ক্ষতিকারক কীট পতঙ্গ ভালোভাবে দমন করা সম্ভব হচ্ছে ৷ এমনকি খাদ্য দ্রব্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে খাদ্য সামগ্রীকে ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণূমুক্ত রাখার ক্ষেত্রেও পরমাণু শক্তি কাজে লাগছে ৷ তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে এ কাজ করা হচ্ছে ৷ গাছপালার জিন বা বংশগতির বৈশিষ্টে পরিবর্তন ঘটিয়ে সেগুলোকে উচচ ফলনশীল করার কাজও পরমাণু প্রযুক্তির অন্যতম অবদান ৷ ইরানের গোরগানে অবস্থিত কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমীক কাউন্সিলের সহকারী প্রধান ডক্টর রমিন রাহমানি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, পরমাণু রশ্মির বিচ্ছুরণ বা বিকিরণের ফলে গাছপালায় জেনেটিক মিউটেশান বা বংশগতির পরিবর্তন দেখা দেয় এবং এর ফলে গাছ পালার বৈচিত্র বৃদ্ধি পায় ও বেশী উন্নত বা অপেক্ষাকৃত বেশী উপকারী উদ্ভিদ জন্ম নেয় ৷ উন্নত জাতের উদ্ভিদ বলতে সাধারণত বেশী ফলদায়ক বা বেশী উৎপাদনশীল, উন্নত বীজ বিশিষ্ট, দ্রুত ফলনশীল এবং প্রতিক‚ল পরিবেশসহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি ও কীট পতঙ্গ প্রতিরোধের ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ভিদকে বোঝানো হয় ৷ পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ ও ভূমির উপরিভাগে অবস্থিত পানির বিভিন্ন উৎসও আবিষ্কার করা হচ্ছে৷ বাঁধের কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা বা বাঁধের কোথাও পানি চুইয়ে বেরিয়ে পড়ছে কিনা তা নির্ধারণ করার কাজেও পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হয়৷ লবনাক্ত পানিকে মিষ্টি পানিতে রূপান্তরিত করার কাজেও পরমাণু শক্তির ব্যবহার দেখা যায়৷ এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের বা রণাঙ্গনে পরিত্যাক্ত প্রাণঘাতি মাইন সনাক্ত করার কাজেও পরমাণু শক্তি ব্যবহার করা হয় ৷তাই এটা স্পষ্ট, শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি খুবই কল্যাণকর একটি প্রযুক্তি ৷ বিজ্ঞানীরা গবেষণা ও নিত্য নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচেছন ৷ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে পরমাণু প্রযুক্তি সম্পর্কে ভয়ানক ধারণা সৃষ্টির জন্যে আমেরিকাসহ পশ্চিমা সরকারগুলোর মাধ্যমে সামরিক ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং পরমাণু বোমার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষকে হত্যার ঘটনাই দায়ী ৷ কেউ কেউ পরমাণু প্রযুক্তির অপব্যবহার করেছে বলে মানব জাতিকে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির কল্যাণকর দিক বা মানব সেবার বহুমুখি কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করার কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না ৷ #পরমাণু শক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার( ২য় পর্ব )জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধি ও ফসিল জ্বালানী ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বের বহু দেশ পরমাণু জ্বালানী ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে ৷ এছাড়াও পরমাণু জ্বালানীর দিকে ঝোঁক বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো, পেট্রোকেমিকেল শিল্পে তেল ও গ্যাসের গুরুত্ব খুব বেড়ে যাওয়ায় জ্বালানী হিসেবে এ দুটি পদার্থের ব্যবহার এখন আর সাশ্রয়ী বা লাভজনক নয় ৷ আর এ জন্যেই বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নতুন, সস্তা এবং পুণঃব্যবহারযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারের চেষ্টা জোরদার করেছে৷ যেমন, বায়ু শক্তি, সৌর শক্তি ও ভূগর্ভস্থ তাপ শক্তি থেকে উৎপাদিত জ্বালানীগুলো দূষণবিহীন এবং বারবার ব্যবহারযোগ্য ৷ কিন্তু এসব নতুন জ্বালানী ব্যবহারের মাত্রা বা সুযোগ এতো সীমিত যে তা দিয়ে মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না৷ কারণ, এ ধরনের জ্বালানীর ব্যবহার বিশেষ মৌসুম বা বিশেষ ভৌগলিক সীমার মধ্যেই সীমিত৷ তাই এ ধরনের জ্বালানী উৎপাদনের জন্যে পুঁজি বিনিয়োগ করা হলেও সব অঞ্চলে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয় না৷ কিন্তু পরমাণু জ্বালানীর উৎস ইউরেনিয়াম প্রচলিত সকল জ্বালানীর চেয়ে অনেক বেশী লাভজনক ও সাশ্রয়ী৷ কারণ, অত্যন্ত অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়৷ ইউরেনিয়াম এমন একটি খনিজ পদার্থ যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই পাওয়া যায়৷ কিন্তু আকরিক বা খনিজ ইউরেনিয়ামকে পরমাণু শক্তিতে রূপান্তরিত করতে অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়৷ বিশ্বের খুব অল্প কটি দেশ খনিজ ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক জ্বালানীতে রূপান্তরিত করার প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পেরেছে৷ অবশ্য এখন বিশ্বে বিপুল সংখ্যক পারমাণবিক চুল্লীর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে৷ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের বিদ্যুতের চাহিদা এসব চুল্লীর মাধ্যমে পূরণ করা হয়৷ বর্তমানে বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪২৷ আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়া, জার্মানী, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, বৃটেন ও সুইডেন পারমাণবিক বিদ্যুৎ ঊৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশ৷ এ দেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি দেশ বিশ্বের প্রধান পারমাণবিক জ্বালানী উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত৷ কয়েক বছর আগেও পরিবেশের জন্যে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হওয়ায় ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী দলগুলো, বিশেষ করে ইউরোপের পরিবেশবাদী গ্রীন বা সবুজ দলগুলো সমস্ত পারমাণবিক চুল্লী বন্ধ করে দেয়ার দাবী জানাচিছল৷ আপনারা এরিমধ্যে শুনেছেন, পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের জন্যে খুবই জটিল প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়৷ আর এ জন্যে খুবই উন্নত মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পারমাণবিক যন্ত্র বা স্থাপনাগুলোর সুরক্ষার দরকার হয়ে থাকে৷ কারণ, খুব ছোটখাটো ভুলের জন্যে পরিবেশের বড় ধরণের ক্ষতি হতে পারে৷ ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চেরনোবিলে অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনায় এক বিস্ফোরণের ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকায়, এমনকি পূর্ব ইউরোপেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে৷ সেই বিপর্যয়ের কথা এখনও সবার মনে আছে৷ আর এ কারণেই ইউরোপের পরিবেশবাদী দলগুলো সমস্ত পারমাণবিক চুল্লী বন্ধ করে দেয়ার ভালো যুক্তি খুঁজে পায়৷ যাই হোক্‌, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জ্বালানী চাহিদা মেটানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সস্তা দরের ফসিল জ্বালানী তথা তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পাথুরে কয়লার মতো জ্বালানীগুলোর যুগ শেষ হয়ে আসেছে৷ বর্তমানে প্রতিদিন ৮ কোটি আশি লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদিত হচ্ছে৷ কিন্তু বিশ্বের তেল উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত৷ নতুন করে আরো পুঁজি বিনিয়োগ করা হলে বড় জোর দৈনিক আরো কয়েক মিলিয়ন তেল বেশী উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে৷ কিন্তু এই অল্প পরিমাণ বর্ধিত তেল দিয়ে চীন ও ভারতের মতো বড় দেশগুলোর উচচতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব নয়৷ বর্তমানে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার খুবই উঁচু৷ বিশ্বে এ দুটি দেশের অর্থনীতির স্থান আমেরিকার পরেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছে৷ একদিকে বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থার দ্রুত বিকাশ এবং অন্যদিকে ফসিল জ্বালানীর সীমাবদ্ধতার কারণে অফসিল জ্বালানী ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে৷ যদিও পারমাণবিক জ্বালানীর ক্ষেত্রে দূর্ঘটনা ঘটলে তাতে বিপদ সৃষ্টি হবে, কিন্তু ব্যাপকভাবে তেল ও গ্যাস ব্যাবহারের ফলেও পৃথিবীর ধবংসাত্মক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে৷ ব্যাপক মাত্রায় জ্বালানী তেল ও গ্যাস ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর পরিবেশ উষ্ণ হয়ে উঠছে এবং এর ফলে বিশ্বের দেশগুলোতে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও ক্ষরা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে৷ ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি মোকাবেলার জন্যে ২০০৫ সালে কিয়েটো চুক্তির আওতায় ফসিল জ্বালানী কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে৷ তাই বলা যায়, বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্যে একমাত্র পারমাণবিক শক্তিই ফসিল জ্বালানীর বিকল্প হতে পারে৷ এছাড়াও পারমাণবিক শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিকাজ, শিল্প ক্ষেত্র এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে৷ এ ধরনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে৷ তাই উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছুতে চায় বা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে উন্নত করার জন্যে মৌলিক পদক্ষেপ নিতে চায় তাহলে শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি অর্জন করা ছাড়া তাদের জন্যে অন্য কোনো উপায় নেই৷ বর্তমানে বিশ্বের যেসব দেশের কাছে পরমাণু প্রযুক্তি রয়েছে তারা সামরিক কাজ ছাড়াও কৃষি, শিল্প ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তিকে ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহার করছে৷ এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশবাদী দলগুলোর প্রতিবাদ বা বিরোধীতা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে৷ এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে জার্মানীর কথা বলা যায়৷ ১৯৮৮ সালে জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেট ও ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেট দলের জোট দেশটির ক্ষমতায় গেলে দুহাজার নয় সাল পর্যন্ত জার্মানীর বেশ কটি পরমাণু চুল্লী বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়৷ কিন্তু ২০০৫ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের পর এ দুটি দল ২০২০ সাল পর্যন্ত পারমাণবিক চুল্লিগুলো চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়৷ অথচ এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জার্মানীর পরিবেশবাদী দলসহ কোনো বিরোধী দলই প্রতিক্রিয়া দেখায়নি৷ অর্থাৎ বর্তমানে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রতি পাশ্চাত্যের জনগণ এবং সব শ্রেণীর রাজনৈতিক দলের সমর্থন রয়েছে৷ এই একই বিষয়ে ইতালীরও দৃষ্টান্ত দেয়া যায়৷ ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল দূর্ঘটনার পর ইতালীর পরিবেশবাদী দলগুলোর চাপে দেশটির চারটি পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল৷ কিন্তু এখন ইতালীর রাজনৈতিক মহলসহ গণমাধ্যমগুলো পুণরায় ঐ পরমাণু স্থাপনাগুলো চালু করার দাবী জানাচেছ৷ ফ্রান্স ও বৃটেনের মতো ইউরোপের বড় বড় দেশগুলো পরমাণু শক্তি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা ছাড়াও বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎও উৎপাদন করছে৷ ফ্রান্সের মোট বিদ্যুতের শতকরা ৮০ ভাগ উৎপন্ন হয় পারমাণবিক চুল্লীগুলোর মাধ্যমে৷ পরমাণু প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের স্থান সর্বশীর্ষের্৷ বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ শিল্পোন্নত দেশ নতুন নতুন পরমাণু চুল্লী নির্মাণ এবং পুরনো পরমাণু চুল্লীগুলোর কার্যকারিতা দীর্ঘায়িত করার জন্যে ব্যাপক কর্মসূচী নিয়েছে৷ এসব বিষয় নিয়ে শিল্পোন্নোত দেশগুলোতে ব্যাপক গবেষণা চলছে এবং এসব খাতে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে৷ এমনকি উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী দেশগুলো পরমাণু সংক্রান্ত নতুন নতুন প্রযুক্তি অর্জনের জন্যে সম্মিলিতভাবে পুঁজি বিনিয়োগও করতে চাচেছ৷ পরমাণু প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পটভূমিতে পরমাণু শক্তির অধিকারী দেশগুলো এ জটিল প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করার পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করার উদ্দেশ্যে সম্মিলিতভাবে পুঁজি বিনিয়োগের এই উদ্যোগ নিয়েছে৷ এরিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতার আওতায় আমেরিকা, ইউরোপীয় জোট, চীন, রাশিয়া ও জাপান সৌরশক্তি নির্ভর সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পদ্ধতিতে পরমাণু শক্তি উৎপাদনের জন্যে বিশেষ একটি চুল্লী নির্মাণের জন্যে ১২০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে৷ সূর্যে যেভাবে প্রাকৃতিকভাবে পরমাণু শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে এ চুল্লীতে সেই পদ্ধতি অনুসরণ করে পরমাণু শক্তি উৎপাদন করা হবে৷ এ চুল্লীটি ফ্রান্সে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং সম্প্রতি ভারতও এ প্রকল্পের অংশীদার হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে৷ ( আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারী ২০০৬ ) #পরমাণু শক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার( ৩য় পর্ব )পরমাণু প্রযুক্তির অধিকারী দেশগুলোর মধ্যে কোনো কোনো দেশ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ৷ কিন্তু পরমাণু শক্তিধর বহুদেশ শিল্প বা অন্যান্য শান্তিপূর্ণ ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ধবংসাত্মক বা গণবিধবংসী অস্ত্র তৈরি করছে ৷ পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী দেশগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে৷ প্রথম ভাগে রয়েছে আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, বৃটেন ও চীন ৷ এই দেশগুলো বিশ্ব পারমাণবিক ক্লাবের পুরনো সদস্য ৷ একইসাথে এ দেশগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেরও স্থায়ী সদস্য ৷ এই দেশগুলো পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটি স্বাক্ষর করেছে ৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও বৃহৎ পঞ্চশক্তি বলে পরিচিত এই দেশগুলো তাদের পরমাণু অস্ত্র ধবংসের ব্যাপারে এই চুক্তির কোনো শর্তই পালন করেনি ৷ পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী দ্বিতীয় শ্রেণীর দেশগুলো পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি ৷ ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও ইহুদিবাদী ইসরাইল এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত ৷ এই দেশগুলো পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য নয় ৷ বিশ্বের অস্ত্র সম্ভারের মধ্যে পরমাণু অস্ত্রকে সবচেয়ে ধবংসাত্মক বা গণবিধবংসি বলে মনে করা হয় ৷ বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকাই সর্বপ্রথম এই ধবংসাত্মক অস্ত্র নির্মাণ করেছে ৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে এ অস্ত্রের অধিকারী হলে বিশ্বের সামরিক ভারসাম্য বদলে যায়৷ একটি পরমাণু বোমার ধবংসাত্মক ক্ষমতা দশ থেকে বিশ কিলোটন টি.এন.টি বা দশ থেকে বিশ হাজার টন টি.এন.টি ৷ টি.এন.টি বা ট্রাই নাইট্রো টলুইন অত্যন্ত উচচ মাত্রার ধবংসাত্মক বিস্ফোরক ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের জনগণের ওপর পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করায় জাপান সরকার আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় ৷ একইসাথে এ ধবংসযজ্ঞ দেখে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার সাথে শক্তির ভারসাম্য রক্ষার জন্যে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের জোর প্রচেষ্টা চালাতে বাধ্য হয়েছিল ৷ মস্কো ১৯৪৯ সালে তার পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন করে ৷ রাশিয়ার পর ফ্রান্স, বৃটেন ও চীন ষাটের দশকে পরমাণু বোমার অধিকারী হয় ৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটে ৷ আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে মূলতঃ গোটা বিশ্ব দুটি ব্লক বা বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে ৷ আর এক্ষেত্রে এ উভয় পরাশক্তির জন্যেই পরমাণু শক্তি পরস্পরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয় ৷ পরমাণু অস্ত্রের উন্নয়ন ও বিস্তারের জন্যে এ উভয় দেশ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ৷ এ উভয় শক্তিই পরমাণু অস্ত্রের ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করে৷ পরমাণু শক্তির কারণে এ উভয় দেশ পাঁচ দশকেরও বেশী সময় ধরে পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থেকেছে ৷ কারণ পরমাণু শক্তিধর এ দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে তাতে কেউই বিজয়ী হতো না ৷ তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের মিত্র দেশগুলোর মধ্যেই সীমিত থেকেছে ৷ সর্বসাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে সাতাশ হাজার ছয়শোটি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে ৷ এর মধ্যে শুধু আমেরিকার কাছে রয়েছে অন্ততঃ দশ হাজার পরমাণু অস্ত্র৷ রাশিয়ার সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা ২০১২ সাল নাগাদ তার পরমাণু অস্ত্রের পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে ফেলবে বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ৷ আমেরিকার বিপুল সংখ্যক পরমাণু অস্ত্র ট্রাইডেন্ট জাতীয় সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজে মোতায়েন রয়েছে ৷ আমেরিকার বাদবাকী পারমাণবিক অস্ত্রগুলো দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র এবং বি-টু ও বি- ফিফটি টু বোমারু বিমানে মোতায়েন রয়েছে ৷ বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রের দিক থেকে বর্তমান রাশিয়ার স্থান দ্বিতীয় ৷ অর্থাৎ বিশ্বে আমেরিকার পরে রাশিয়ার কাছেই সবচেয়ে বেশী পরমাণু অস্ত্র রয়েছে ৷ অবশ্য সোভিয়েত ইউনিয়েন ভেঙ্গে যাবার পর রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা অনেক কমে গেছে৷ রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় দেশটির সামরিক বাজেট ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে ৷ এমনকি দেশটি তার পরমাণু স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের খরচও যোগাতে পারছে না ৷ তাই রাশিয়া তার অনেক পারমাণবিক সাবমেরিন ও পরমাণু স্থাপনার কার্যকরি ব্যবহারের প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পরও সেগুলোকে নবায়ন করার বা সেগুলোতে ব্যবহৃত পুরনো যন্ত্রপাতির পরিবর্তে নতুন যন্ত্রপাতি বসানোর উদ্যোগ নেয়নি৷ ইউরোপের পরমাণু শক্তিধর আরেকটি দেশ হলো ফ্রান্স ৷ ফ্রান্স ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে ২১০ টি পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করেছে ৷ ১৯৯২ সালে এ দেশটির পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১১০টিতে ৷ ফ্রান্সের ৮৪ টি বিমান ও চারটি ডুবোজাহাজের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশ পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন রয়েছে ৷ ফ্রান্সের পর বৃটেন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরমাণু শক্তি৷ ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৯২ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ৮৩৪টি পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করেছে ৷ বৃটেনেরও চারটি পারমাণবিক ডুবো জাহাজ রয়েছে ৷ এই ডুবোজাহাজগুলোর প্রত্যেকটিই ১৬টি ট্রাইডেন্ট ক্ষেপনাস্ত্রে সজ্জিত ৷ চীন পারমাণবিক ক্লাবের পঞ্চম সদস্য ৷ এই দেশটির কাছে ৪০০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং পরমাণু অস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্যে বিভিন্ন ধরনের উৎক্ষেপণ মঞ্চও রয়েছে ৷ চীন তার অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করে চলেছে৷ অর্থনৈতিক ভিত্তি ক্রমেই জোরদার হতে থাকায় চীন বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী সামরিক পরিকল্পনা নিয়েছে ৷ আমরা আগেই বলেছি, আমেরিকা, রাশিয়া, ফ্রান্স, বৃটেন ও চীন পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটি স্বাক্ষর করেছে ৷ এ চুক্তি অনুযায়ী এই দেশগুলো পরমাণু অস্ত্র ধবংস করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ৷ কিন্তু এ পাঁচটি দেশ ছাড়াও পরমাণু শক্তির অধিকারী অন্য চারটি দেশ পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তার রোধ সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি ৷ এ চারটি দেশ হলো ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও অবৈধ রাষ্ট্র ইহুদিবাদী ইসরাইল৷ ভারত সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে৷ এরপর দেশটি ১৯৮৮সালে আরো ৫টি পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়৷ ভারতের পরমাণু অস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা কয়টি তা নিয়ে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না৷ তবে মনে করা হয় ভারতের কাছে ৭৫ থেকে ১১০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে৷ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ৮০’র দশকে পরমাণু তৎপরতা শুরু করে৷ পূর্ব এশিয়ার অন্য একটি দেশ উত্তর কোরিয়ার কাছে নয়টি পরমাণু অস্ত্র আছে বলে মনে করা হয়৷ আমেরিকা ছয়-জাতি আলোচনার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে তার পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচী পরিত্যাগে রাজী করানোর চেষ্টা করছে৷ এই ছয়পক্ষীয় আলোচনার শরীক দেশগুলো হলো, চীন, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া , আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া৷ আমেরিকা চায় পরমাণু অস্ত্র শুধু পারমাণবিক ক্লাবের সদস্য দেশের মধ্যেই সীমিত থাকুক৷ অর্থাৎ পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী ৫টি দেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশের কাছে পরমাণু অস্ত্র থাকুক তা আমেরিকার কাম্য নয়৷ অবশ্য আমেরিকার এ নীতির ক্ষেত্রে ইসরাইলকে ব্যতিক্রম ধরা হয়েছে৷ আমেরিকা ষাটের দশকের প্রথম থেকেই দখলদার ইসরাইলকে পরমাণু ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে আসছে৷ বর্ণবাদী ইসরাইল ১৯৬৭ সালে প্রথমবারের মতো পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ করে৷ দখলদার ইসরাইলের পরমাণু অস্ত্রের সঠিক সংখ্যা কতো তা জানা বেশ কঠিন৷ তবে ইহুদিবাদী ইসরাইলের কাছে প্রায় ২০০ টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে বলে মনে করা হয়৷ ১৯৪৫ সালে মার্কিন পরমাণু বোমার আঘাতে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর দুটি ধবংস হয়ে গেলে বিশ্ববাসী পরমাণু বোমার প্রলয়ংকরি ধবংসাত্মক ক্ষমতা সম্পর্কে অবহিত হয়৷ কিন্তু পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন ও বিস্তার নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটি প্রণয়ন করতে বিশ্ব সমাজ আরো দুই দশক সময় নেয়৷ বিশ্ব সমাজ ১৯৬৯সালে এ চুক্তিটি স্বাক্ষর করে৷ এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পর আমেরিকা ও রাশিয়া তাদের পরমাণু অস্ত্রগুলোর সংখ্যা কমানোর জন্যে আরো কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করে৷ এ চুক্তিগুলো সল্ট-এক, সল্ট-দুই, স্টার্ট-এক ও স্টার্ট দুই নামে পরিচিত৷ কিন্তু পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী কোনো দেশই এনপিটিতে উল্লেখিত শর্ত অনুযায়ী পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে ফেলতে রাজী হয়নি৷ সল্ট-এক, সল্ট-দুই, স্টার্ট-এক ও স্টার্ট দুই প্রভৃতি চুক্তির ওপরও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রভাব পড়ে ৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ নিরসনের লক্ষ্যে, পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করানো চুক্তি তথা কম্প্রিহেন্সিভ টেষ্ট ব্যান ট্রিটি বা সংক্ষেপে সি টি বি টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ৷ কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী দেশ আমেরিকা এখনও এ চুক্তি অনুমোদন করতে রাজী হয়নি ৷ আর এ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ করতে আগ্রহী বলে যে প্রচারনা চালিয়ে থাকে, তা সত্য বা আন্তরিক নয় ৷ আসলে মার্কিন সরকার শুধু বিশ্বব্যাপী নিজের আধিপত্য ও কর্তৃত্ব বিস্তারের স্বপ্নেই বিভোর ৷ # ( আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ ) #পরমাণু শক্তির ব্যবহার ও অপব্যবহার( ৪র্থ পর্ব )যখনই পরমাণু বোমার নাম উচচারিত হয়, তখনই বিশ্বের জনগণের মনে মার্কিন সরকারের ছবি ভেসে ওঠে ৷ কারণ মার্কিন সরকারই হচ্ছে বিশ্বের একমাত্র সরকার যে সরকার সর্বপ্রথম পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং তারা এ গণবিধবংসী অস্ত্র ব্যবহার করেছিল সম্পূর্ণ নিরাপরাধ জনগণের বিরুদ্ধে ৷ এ বর্বোরোচিত বোমা হামলা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালে৷ মার্কিন পরমাণু বোমার ঐ হামলায় কয়েক মুহূর্তের মধ্যে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের লক্ষাধিক নিরাপরাধ নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ সম্পূর্ণরুপে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং হাজার হাজার মানুষ মারাত্মক অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়ে যায় ৷ মার্কিন সরকার এ ধরণের বোমা নির্মাণের কাজ শুরু করেছিল ১৯৪২ সালে ৷ যে প্রকল্প বা পরিকল্পনার আওতায় মার্কিন সরকার এ ধরণের অস্ত্র নির্মাণের চেষ্টা করেছিল সেই প্রকল্পটির নাম ছিল ম্যানহাটন পরিকল্পনা ৷ অনেক বিজ্ঞানী ও কয়েক হাজার কর্মীর প্রচেষ্টায় ব্যাপক সাজ-সরঞ্জাম তৈরি করে আমেরিকা ১৯৪৫ সালের ১৬ই জুলাই তার প্রথম পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালায় ৷ এর পরপরই দেশটি আরো বেশী পরমাণু বোমা তৈরি করতে থাকে ৷ প্রথম পরমাণু বোমার পরীক্ষা সম্পন্ন করার অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানের দুটি শহরে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে৷ ১৯৪৫ সালের ৬ ই আগষ্ট তিন লক্ষ নাগরিকের শহর হিরোশিমা মার্কিন পরমাণু বোমার আঘাতে এক মুহূর্তের মধ্যেই যেন জাহান্নামের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়৷ আমেরিকার তৎকালীন ক্ষমতাসীন যুদ্ধবাজ মহল এই গণহত্যা চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি৷ হিরোশিমায় পরমাণু বোমা নিক্ষেপের তিন দিন পর তারা জাপানের নাগাসাকি শহরেও পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে শহরটি ধবংস করে দেয়৷ হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের নারী ও শিশুসহ এক লক্ষ দশ হাজারেরও বেশী বেসামরিক নাগরিক অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হয় এবং হাজার হাজার মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়৷ হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন পরমাণু বোমা হামলার ষাট বছর পরও ঐ শহর দুটির বেঁচে যাওয়া অনেক নাগরিক এখনও দূরারোগ্য বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করছে৷ এমনকি তাদের পরবর্তি প্রজন্মও পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় পদার্থের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে৷ এভাবে মার্কিন সরকার পরমাণু প্রযুক্তি অপব্যবহারের মাধ্যমে ইতিহাসের নজিরবিহীন মহাবিপর্যয় ও সর্ববৃহৎ গণহত্যার খলনায়কে পরিণত হয়েছে৷ মার্কিন সরকার বলে থাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানোর জন্যেই তারা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছিল৷ কিন্তু ঐতিহাসিক বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে জানা যায় জাপান পারমাণবিক বোমা হামলার শিকার হবার আগেই আত্মসমর্পণের জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল৷ রাজনৈতিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর আমেরিকা এক মহাসামরিক শক্তি বা পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে এটা বোঝানোর জন্যে এবং বিশ্ববাসী ও সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকার শক্তিমত্তা সম্পর্কে ত্রাস সৃষ্টির জন্যে জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল৷ কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর আমেরিকার কর্তৃত্বকামী শাসকরা যেমনটি আশা করেছিলেন, বিশ্বের পরিস্থিতি সেভাবে এগোয়নি৷ কারণ, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্ব অঙ্গনে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়৷ সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া আমেরিকার চার বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৯ সালে তার প্রথম পরমাণু বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়৷ ফলে সারা বিশ্বে পুণরায় উত্তেজনা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরমাণু বোমা তৈরির অশুভ বা উন্মত্ত প্রতিযোগিতার যুগ শুরু হয়৷ এই যুগে আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন নতুন পরমাণু অস্ত্র তৈরি ও একে অপরের চেয়ে বেশী পরমাণু অস্ত্র তৈরি করাকে নিজের জন্যে জরুরী বলে মনে করতো৷ এ দুটি দেশ ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মানুষ হত্যার লক্ষ্যে ব

আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশের পর পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া




আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশের পর পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তিসংস্থা বা আইএইএর মহাসচিব মো: আল বারাদি ইরানের পরমানু কর্মসূচীর ব্যাপারে তার সর্বশেষ প্রতিবেদন সম্প্রতি এই সংস্থার নির্বাহী বোর্ডে তুলে ধরেছেন। এটাকে আল বারাদির এ যাবতকালের সবচেয়ে যৌক্তিক ও ইতিবাচক প্রতিবেদন হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইরান এবং আইএইএর কর্মকর্তারা ভিয়েনা ও তেহরানে তিন দফা আলোচনার পর আগামী দুই মাসের মধ্যে ইরানের পরমাণু বিষয়ে বিরাজমান অস্পষ্টতা দূর করা ও আইএইএর অবশিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছার পর আল বারাদির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতা হওয়ার খবর প্রকাশের কয়েক দিন পর আল বারাদির সচিব ওয়ালী হাইনোনেন ভিয়েনায় বলেছিলেন, ইরান তার প্লুটোনিয়াম গবেষণা সংক্রান্ত আইএইএর সমস্ত প্রশ্নের যথাযথ জবাব দিয়েছে এবং এই সংস্থা এখন মনে করে ইরানের প্লুটোনিয়াম বিষয়ে বিতর্কের আর কোন অবকাশ নেই।
এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে যে হৈ-চৈ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে প্লুটোনিয়াম সংক্রান্ত গবেষণা। কারণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সময় প্লুটোনিয়াম উৎপন্ন হয় এবং এটি দুই ধরণের কাজে ব্যবহার করা যায়।
ইরান বহুবার একথা বলেছে যে, বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রপাতিগুলো আগে থেকেই দুষণযুক্ত ছিল এবং শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত ইরানের পরমাণু প্লান্টে কখনও কোন প্লুটোনিয়াম উৎপন্ন হয়নি। আইএইএর পরিদর্শক দল ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করার পর গত ২০ শে আগষ্ট এই সংস্থা ঘোষণা করে, ইরানের কর্মকর্তাদের কথায় ও কাজে মিল পাওয়া গেছে, সুতরাং প্লুটোনিয়াম নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটলো। ইরান ঘোষণা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যদি কোন ষড়যন্ত্র এবং হস্তক্ষেপ না করে তাহলে অন্তত আগামী দুই মাসের মধ্যে ইরানের পরমাণু বিষয়ে সকল বিতর্কের অবসান ঘটবে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং এর মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে এসেছে। এ কারণে বিভিন্ন সংবাদ ও রাজনৈতিক মহল বিশেষ করে ভিয়েনায় আইএইএর কর্মকর্তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির প্রতিবেদনকে ইতিবাচক হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু আগেই যেটা ধারণা করা হয়েছিল সেটা হচ্ছে, আল বারাদির এ রিপোর্ট এবং ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের প্রচন্ড বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছে। এই দেশগুলোর বিরোধীতার কারণ অবশ্য সবারই জানা। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে চেষ্টা চালাচ্ছে আল বারাদির এ প্রতিবেদন তাদের সে চেষ্টাকে ভন্ডুল করে দেবে। যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই ইরানের পরমাণু কর্মসূচীকে হুমকী হিসাবে তুলে ধরে তার অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স ইরান এবং আইএইএর মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতার আগে থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিল।
কূটনৈতিক উপায়ে ইরানের পরমাণু সমস্যার সমাধান হোক যুক্তরাষ্ট্র তা কখনই চায় না এবং ওয়াশিংটন লন্ডন ও প্যারিসকে সাথে ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চরিতার্থ করার চেষ্টায় রয়েছে। এই তিন দেশের পদস্থ কর্মকর্তারা আল বারাদির প্রতিবেদন অগ্রাহ্য করে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে তাদের অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলা অব্যাহত রেখেছে। অথচ আল বারাদি তার প্রতিবেদন প্রকাশের একদিন পর জার্মানীর দৈনিক স্পিগেল পত্রিকাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে অধিকাংশ অস্পষ্টতা বা সন্দেহ দূর হয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ইরান ও আইএইএর মধ্যে আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা থেকে বিরত থাকা উচিত এবং সেই সাথে কূটনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেয়া উচিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা আল বারাদির এ বক্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়ে উল্টো তার উপর ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে। ফলে আল বারাদি এ কথা বলতে বাধ্য হন যে, সামরিক উপায়ে যারা ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধান করতে চায় তারা আসলে যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে।
আইএইএর মহাসচিব আল বারাদি গত মাসেও বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যারা সামরিক উপায়ে ইরানের পরমাণু সর্মসূচী স্তব্ধ করে দেয়ার কথা বলছে, তারা ইরাকের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্স ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রতি বাহ্যিক সমর্থন জানালেও তাদের আচরণ ও কাজেকর্মে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে তারা আসলে কূটনৈতিক সমাধান চায় না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র সবসময়ই আইএইএ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা জ্যাভিয়ার সোলানার সাথে ইরানের আলোচনায় অচলবস্থা সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ গত সপ্তায় মার্কিন সেনাদের এক সমাবেশে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরীর চেষ্টা করছে বলে দাবী করে বলেছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরীতে সক্ষম হলে মধ্যপ্রাচ্য পরমাণু হলোকাস্ট প্রত্যক্ষ করবে। বুশের এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রই পরমাণু হলোকাষ্টের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা নিক্ষেপের ঘটনা এবং দেশটির নতুন ধরণের পরমাণু বোমা তৈরীর প্রচেষ্টার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
বৃটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের মার্কিন তোষণ নীতির বিরোধীতা করলেও এখন তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে আল বারাদির প্রতিবেদনের বিরোধীতা করেছেন। নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের উদ্যোগকে লন্ডন সমর্থন করবে বলে গর্ডন ব্রাউন জানান। তিনি লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন করে ইশতেহার প্রকাশের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা সঠিক এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী এর আগে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা পরিষদের ঘোষিত তিনটি ইশতেহারকেও সঠিক বলে অভিহিত করেছেন। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে এ ধরণের উদ্দেশ্যমূলক ইশতেহার প্রকাশ ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানে কোন ভূমিকাতো রাখবেই না বরং পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের সাথে সুর মিলিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোযিও আইএইএর মহাসচিব আল বারাদির প্রতিবেদনকে উপেক্ষা করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর উদ্দেশ্য সামরিক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবী করেন পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী ইরানকে ফ্রান্স কখনই মেনে নেবে না।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্রসহ মাত্র গুটি কয়েক ইউরোপীয় দেশ যদি অযথা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরোধীতায় অবতীর্ণ না হত তাহলে আল বারাদির এবারের প্রতিবেদন ইরানের পরমাণু সমস্যা নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারতো। কিন্ত সমস্যাটা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরমাণু ইস্যুটিকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আর এ কারণেই তারা যে কোন উপায়ে এ সমস্যা জিইয়ে রাখতে চাইছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বলেছেন, ইরান আইএইএর সাথে সম্পাদিত চুক্তি বা সমঝোতা অনুযায়ী পরমাণু বিষয়ে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আল আরাদিও ইরানের এ পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
আইএইএর সাথে ইরানের সহযোগিতা এবং ইরানের পরমাণু বিষয়ে আল আলবাদির ইতিবাচক প্রতিবেদন দুপক্ষের মধ্যে আলোচনার নতুন সুযোগ বা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ ব্যাপারে আলী লারিজানি বলেছেন, আলোচনার যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা মূলত: ৫+১ গ্রুপ ও আইএইএর জন্য একটা পরীক্ষা। কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিমারা আইএইএর আওতায় ইরানের পরমাণু সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কিন্তু আল বারাদির প্রতিবেদনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও বৃটেন যে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে তাতে বোঝা যায়, এই দেশ তিনটি নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে আরো একটি ইশতেহার প্রকাশের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। তবে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তা পরিষদের বেআইনী পদক্ষেপ, শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযু্ক্তি ব্যবহারের অধিকার থেকে ইরানের জনগণকে বিরত রাখতে পারবে না।
এখন এটা সবার কাছে পরিস্কার যে, পশ্চিমারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে সরাসরি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। মোহাম্মদ আল বারাদি সম্প্রতি কোন দেশের নাম উল্লেখ না করে, ইরান ও আইএইএর মধ্যে সমঝোতা এবং তার প্রতিবেদনের ব্যাপারে পশ্চিমাদের নেতিবাচক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। আল বারাদি বলেছেন, আইএইএর ইরানের পরমাণু কর্মসূচীতে বিচ্যুতির কোন প্রমাণ পায়নি এবং ইরান বেআইনী পরমাণু তৎপরতা চালাচ্ছে এমন কোন প্রমাণ পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও দেখাতে পারেনি।
পশ্চিমারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচী বিশ্বের জন্য হুমকী বলে যে দাবী করছে আল বারাদির এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের সে দাবী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তারপরও আইএইএর মহাসচিবের এ প্রতিবেদন ওয়াশিংটন, লন্ডন ও প্যারিসের তেহরান বিরোধী মনোভাবের অবসান ঘটাবে বলে মনে হয় না। আল বারাদির প্রতিবেদন থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে, ইরানের পরমাণু সমস্যা আইএইএর মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব এবং পশ্চিমারা ইরানের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছে তা আন্তর্জাতিক সমাজের কাম্য নয়। ( আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর-২০০৭) #







































stat(22,0);